বাক প্রতিমা

।বাকপ্রতিমার বিশেষ সংখ্যায় তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।

না দেখা এক সদ্য প্রাক্তন ছাত্রের লজ্জাবতী শীর্ষক একটি দীর্ঘ কবিতা ( এক সুন্দরীর দেহ বর্ণনা নিয়ে ) বছর ষাটেক আগে আশুতোষ কলেজের কলেজ ম্যাগাজিনে স্থান পায়। আর একে কেন্দ্র করে ম্যাগাজিন সম্পাদকের বিরুদ্ধে তদন্ত বসে। সতর্ক বার্তা আসে কলেজ কর্তৃপক্ষের থেকে। তদন্তের ফল বিরুদ্ধে গেলে কলেজ থেকে বিতাড়িত হতে হবে পত্রিকা সম্পাদককে। বক্তা বলছেন সেই তদন্তও আজকের দিনের অনেক তদন্তের মতো ছিল। অর্থাৎ তদ – ‘অন্ত ‘এর মতো। তাই সৌভাগ্যক্রমে কলেজে থেকে বিতাড়িত হতে হয় নি। দুজনেই পরবর্তীকালে পেশাগতভাবে হয়ে উঠেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আমলা। তখনই তাঁদের মধ্যে হয় আলাপ পরিচয়।

কলেজের সেই পত্রিকা সম্পাদক হলেন আজকের বিখ্যাত সাহিত্যিক Bhagirath Mishra ।আর সেই কবি যিনি বেশ কয়েকটি কাব্য গ্রন্থের প্রকাশের পাশাপাশি অজস্র গল্প, উপন্যাস ,প্রবন্ধ, গোয়েন্দা কাহিনীকে পাঠকের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছেন।বহু পুরস্কারের সঙ্গে পেয়েছেন দু দু বার সাহিত্য একাডেমিও। সেই কবি হলেন সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। কবি জানালেন সেই কবিতাটি ছিল তার ছাপার অক্ষরে দ্বিতীয় কবিতা।

সুদূর আন্দামান থেকে প্রায় ২৬বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে চলা বাকপ্রতিমা সাহিত্য পত্রিকায় তপন বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা উদ্বোধনে এসে কলেজ স্ট্রীটের একটি সভাঘরে গতকাল সেই গল্পটি দিয়ে সাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্র শুরু করলেন তাঁর বন্ধুর সাহিত্য প্রতিভার কথা। কিভাবে তিনি ধীরে ধীরে আজ হয়ে উঠেছেন এ গ্রেড সাহিত্যিক। পত্রিকা সম্পাদক অনাদি রঞ্জন বিশ্বাস জানালেন তিনি কীভাবে তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্নেহে ও সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯৯৯ সালে তিনি পত্রিকা বার করে চলেছেন। এটি সেই যাত্রাপথের ১৬৮ তম সংখ্যা। বিশেষ সংখ্যা হিসাবে আগের বছর তসলিমা নাসরিনের উপর একটি সংখ্যা বের করেছেন। সাড়ে চারশত পৃষ্ঠার সমৃদ্ধ এই বিশেষ সংখ্যাটিতে লিখেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের ৪২ জন ব্যক্তি। ব্যক্তি তপন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার কথা লিখেছেন। রয়েছে তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখালিখি নিয়ে দুটি দীর্ঘ সাক্ষাতকার। সময়, পত্রিকা ধরে ধরে রয়েছে নয় পাতা জুড়ে বিভিন্ন লেখার একটি সূচি। রয়েছে চার পাতা জুড়ে তাঁর বিভিন্ন সম্মাননার কথা। আর এই দীর্ঘ লেখক তালিকায় রয়েছে বহু গুরুত্বপুর্ন ব্যক্তি। এই পত্রিকা প্রকাশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন ও বহু গুণী ব্যক্তি।

এই সব কথার মাঝে একটি লজ্জার কথা না বললেই নয়। এ হেন তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় মাত্র বছর তিনেকের। তাঁর এই সমুদ্রের মতো বিশালতার লেখার মধ্য থেকে পড়েছি খুবই সামান্য। তার মধ্যে আমলাগাছি বইটি আমাকে খুবই টেনেছিল। সেই সূত্রে দুরাভাসে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। আরও কয়েকটি বই পড়া। তারপর মুখোমুখি দেখা। কাঁথি বইমেলা উদ্বোধনে আসা। এবং সহজ সরল ভাবে আমার বাড়িতে পোঁছে যাওয়া। এই সংখ্যায় এগুলো উল্লেখ করেই একটি লেখা রয়েছে আমার। বিশেষ ভাবে রয়েছে তাঁর ‘৫১ টি বিচিত্র গল্প ‘ বইটিকে নিয়ে কিছু কথা। কেমন হয়েছে তা জানিনা। তবে এই রকম একটি বইটিতে লেখাটি স্থান পাওয়ার জন্য কোনো কৃতজ্ঞতায় যথেষ্ট নয় সম্পাদক Anadiranjan Biswas ও Tapan Bandyopadhyay কাছে।

শেষ করি তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারের একটি অংশ দিয়ে। এটুকু পড়লেই কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যাবে সাহিত্যে জীবনকে তিনি কতটা কাছ থেকে দেখতে আগ্রহী।যেটি লেখা হয়েছে বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক জ্যোতির্ময় দত্ত ( ‘আমার নাইবা হলো পারে যাওয়া’ র লেখক ) সম্পর্কে বলতে গিয়ে।
” জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর ‘কলকাতা ‘ পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা ছাপা হয়েছিল, যার জেরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ। জ্যোতির্ময় দত্তকে গ্রেপ্তার করার আগেই তিনি গিয়েছিলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেই জরুরি অবস্থার মধ্যে তাঁকে এসপ্ল্যানেডে দেখে বলেছিলাম , আন্ডারগ্রাউন্ড জায়গাটা কোথায়? তিনি বলেছিলেন ,’ চলো তোমাকে কাল সকালে দেখিয়ে নিয়ে আসি।’ জ্যোতির্ময় দত্তকে আমি এতটাই শ্রদ্ধা করতাম যে, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে তাঁর সঙ্গে চলে গিয়েছিলাম বাংরিপোষীতে; চারিদিকে পাহাড় ঘেরা একটি ছোট্ট গ্রাম। কয়েকদিন ছিলাম একটি ছিটেবেড়ার ঘরে। সেই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা লিখেছি ‘ ‘ আমাদের জরুরি দিনগুলি ‘ উপন্যাসে। একজন ওয়ারেন্টির সঙ্গে বাস করার অর্থ, পুলিশ জানতে পারলে আমাকেও গ্রেফতার করত। কিন্তু ঝুঁকি না নিলে কোনও বড় কাজ করা যায় না। লেখা হয়ে গেলে একটা অন্যরকম উপন্যাস। তবে পৃথক গ্রন্থ হিসাবে প্রকাশিত হয় নি।আমার ‘দশটি উপন্যাস ‘ এর প্রথম উপন্যাস এটি ।”
এখানে উল্লেখ করা দরকার তপন বন্দ্যোপাধ্যায় তখন সেই সরকারেরই একজন আমলা। সম্ভবত ভগবানগোলা কিংবা কাকদ্বীপের বিডিও ।অজানাকে জানার প্রতি, সেই সঙ্গে সঠিক লেখার প্রতি এরকম নিজেকে উৎসর্গ কতজন করতে পারেন ?
প্রণাম নেবেন তপনদা

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *