জীবন্ত কিংবদন্তি লাভপুরের সুকুমার চন্দ্র
৯৮ বছর বয়সে চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছেন
সবার পরম আত্মীয়
।।জীবন্ত কিংবদন্তী লাভপুরের সুকুমার চন্দ্র।।
সময়টা ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম কি দ্বিতীয় রবিবার। অফিসের কাজে সেই সময় সাঁইথিয়াতে। রবিবার বাড়ি না ফিরতে পেরে সাঁইথিয়া থেকে লাভপুর গিয়ে দেখতে পেয়েছিলাম এক ধন্যন্তরী চিকিৎসক সুকুমার চন্দ্রকে। তখন তাঁর বয়স ৯১ বছর। তিনি হলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের চিকিৎসক। তারাশঙ্কর বাবুর বহু গল্প উপন্যাসের চরিত্রও বটে সুকুমার চন্দ্র। এরকম এক জীবন্ত কিংবদন্তী চিকিৎসককে নিয়ে বা একটু অন্যরকম ভাবে বললে এরকম একজন মানুষরূপী দেবতাকে নিয়ে একটি বড় লেখা আজকাল পত্রিকায় রবিবারের পাতায় কভার স্টোরি হিসাবে ছাপাও হয়েছিল। তারিখটা ছিল ২১ নভেম্বর ২০১৯। প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং ডাক্তারবাবু।
এরপর করোনা আসে। চারিদিকে যখন বহু চিকিৎসকরা হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন তখন তিনি কিন্তু সব ছেড়েছুড়ে ঘরের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেন নি। বয়সের কারণে আত্মীয় পরিজনতো বটেই নিজের বাড়ি থেকে এমনকি চিকিৎসক পুত্রও পরামর্শ দিয়েছিলেন বয়সের কারণে এই মুহূর্তে নিজেকে আটকে রাখতে। এবং তিনি যেন কলকাতায় ছেলের কাছে চলে যান।সেই সময় একদিন ফোন করাতে তিনি বলেছিলেন সবাই তো এসব বলছেন বটে কিন্তু আমার রোগীদের কি হবে? তারা এই সংকটে চিকিৎসা পাবেন কোথায়? এ অবস্থায় তাদের ছেড়ে দেওয়া যায় না। এই হচ্ছে চিকিৎসক সুকুমার চন্দ্র ।
এরপর হটাৎই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তাঁর একমাত্র চিকিৎসক পুত্র।খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। সেই সময়ও ফোনে বলেছিলেন পুত্র শোকের আঘাতের সঙ্গে কোনোকিছুই তুলনা হয় না। তবু কলকতা গিয়ে আমার পুত্রের সেই যন্ত্রণাক্লিস্ট মুখ দেখে কী করতে পারবো? তাই রোগী দেখছি। হয়তো নিজের কষ্টটা কিছুটা ভুলে থাকা যাবে। আর আমার রোগীরাও তাদের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না। এই হচ্ছে চিকিৎসক সুকুমার চন্দ্র।
এরপর তাঁর স্ত্রীকে হারালেন ।কান্না চেপে নিজের হাতেই লিখলেন স্ত্রীর ডেথ সার্টিফিকেট। তাও চেম্বার বন্ধ হয় নি। লাভপুরতো বটেই বীরভূম ছাড়িয়েও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবার জন্য চেম্বারে বসেছেন এই মহান চিকিৎসক সুকুমার চন্দ্র।
এরপর এসেছে নিজের জীবনের সংকটময় দিন।
বারে বারে যেতে হযেছে হাসপাতালে।এই বছরেও যেতে হয়েছেও বার তিনেক। প্রতিবারেই জীবন মৃত্যর সন্ধিক্ষণকে অতিক্রম করেছেন। তবু আজও খুব শারীরিক অসুবিধা না হলে ঘরের মধ্যে জানালার সামনে বসে জানালার বাহিরে থাকা রোগীদের অসুবিধার কথা শোনেন। নিজের হাতে প্রেসক্রিপশন লেখেন। সেই সময় বাড়ির কেউ কিছু বলতে গেলে আজও অসন্তুষ্ট হন। একেবারে ঠিক আজকেও কয়েকজনের জন্য প্রেসক্রিপশন লিখেছেন বলে জানালেন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী পুত্রসম অলক কুমার মিশ্র। আরো জানালেন নিয়ম করে অক্সিজেন নেওয়া থেকে বহু ঔষধ সকাল সন্ধ্যে নিয়ম করে রাত্রি পর্যন্ত খেয়ে যেতে হয়। শুয়ে শুয়েই দিন রাত কেটে যায়। তবু তারই মাঝে বই পড়া, রেডিও শোনা,চিকিৎসা সংক্রান্ত জার্নাল পড়া চলে। এই হচ্ছে মানব দরদী স্বল্পমূল্য ফী নেওয়া ধন্যন্তরী চিকিৎসক সুকুমার চন্দ্র।
এরকম এক চিকিৎসককে সঙ্গে আজ আবার প্রনাম করার সৌভাগ্য হলো। আরো অনেক গুণী মানুষের উপস্থিততে আমার ওই ২০১৯সালের লেখাটি একটু বাঁধিয়ে তুলে দিলাম ডাক্তারবাবুর হাতে। অনেকক্ষণ ধরে সেটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন । ব্যবহৃত হওয়া একটি ছবি সম্পর্কে কথাও বললেন। ভিডিও কলে আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বললেন। নিমগ্ন হয়ে তাকে ভিডিও কলে দেখে কথাও বললেন। জিজ্ঞাসা করলেন তার (মেয়ের) ছবির পিছনে দেখতে পাওয়া দোলনায় কে চড়ে? উল্লেখ্য সেই প্রথম সাক্ষাতের দিনে আমার সঙ্গে আমার মেয়েও ছিল। এই হচ্ছে সব মানুষের পরম আত্মীয় আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই চিকিৎসক সুকুমার চন্দ্র।
আমার কাছে এটি খুব খুবই ভালো লাগার একটি দিন।
ভালো থাকবেন Ujjal Mukhopadhyay ও Dipak Bara Panda যাদের জন্য লাভপুরে আসা এবং ডাক্তারবাবুর হাতে তাঁকে নিয়ে লেখাটি ডাক্তারবাবুর হাতে তুলে দেওয়া।




