।। বেজাত থেকে জাতে ওঠার কাহিনী।।

।।বেজাত থেকে জাতে ওঠার কাহিনী ।।

” নাটক দেখতে সেই সময় মানুষের বেশ ভিড় হতো। তন্ময় হয়ে নাটকের চরিত্রগুলির সঙ্গে তারা মিশেও যেতেন। কিন্তু নাটক দেখে বেরিয়ে যাওয়ার পর নটনটীদের অস্পৃশ্য মনে করতেন। অর্থাৎ সেই কুশীলবরা সবাই বেজাত। কারণ মেয়েরা যারা অভিনয় করতেন তাদের পিতৃ পরিচয় নেই। তারা এক একজন বারাঙ্গনা।অন্যদিকে পুরুষ নটরাও এই ছাপ থেকে ছাড় পেতেন না। কারণ পুরুষদের মনে করা হতো এরা বাবার পয়সা ওড়াতে এসেছে।অথচ সেই সব দর্শক বাবুদের ওই বেজাত নটীদের ছোঁয়ার ইচ্ছে থাকতো ষোলো আনা।এবং সেটাই ছিল সেসময়ের রীতি । আর এই অস্পৃশ্যতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাহিত্যিক হেমেন্দ্র কুমার রায়ের এক প্রশ্নের উত্তরে স্বয়ং গিরিশ ঘোষের মতো থিয়েটারের বিশিষ্ট মানুষও তাঁর জীবনের একেবারে শেষ ভাগে পৌঁছে বলেছিলেন উচ্চ শিক্ষিতরা আমাদের থিয়েটার দেখে খুশি হন বটে তবে মনে মনে তারা আমাদের ঘৃণা করেন। এরকম সব পরিস্থিতির মাঝে ১৮৮৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর গিরিশ ঘোষের চৈতন্যলীলা নাটক দেখতে এসেছিলেন স্বয়ং ঠাকুর রামকৃষ্ণ। স্টার থিয়েটারে ওই নাটকে শ্রী চৈতন্যের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিনোদিনী। এবং সেই অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে বিনোদিনীর মাথায় হাত রেখে রামকৃষ্ণদেব আশীর্বাদ করে বলেছিলেন ‘তোর চৈতন্য হোক ‘ । বলা চলে থিয়েটারের মানুষদের বিশেষ করে নটীদের জাতে ওঠার সেই শুরু। “

এরকম অনেক উদাহরণ দিয়ে গতকাল ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় তপন থিয়েটারের শুরু হয়েছিল ‘দেহপট সনে নট :বাঙালির থিয়েটারে অভিনেতৃর দেহ, জাত বেজাত ও জাতে ওঠার সংগ্রাম ‘ শীর্ষক একটি আলোচনা । অনীক নাট্যগোষ্ঠীর উদ্যোগে আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, লেখক ও সাংবাদিক শিশির রায়। পৌনে দুই ঘণ্টা ধরে তিনি থিয়েটারের বিভিন্ন ধারায় অভিনয় করতে আসা ওই বেজাত অভিনেতৃদের একটার পর একটা অজানা কাহিনী উন্মোচন করে গেলেন। শোনালেন বিনোদিনী ,সুকুমারী দত্ত, তারাসুন্দরী, কৃষ্ণভামিনী, হরিসুন্দরী, নিরদাসুন্দরীদের কথা। যাদের কোনো পিতৃ পরিচয় ছিল না। এসেছিলেন বেশ্যালায় থেকে। কিন্তু এদের একজন আরেকজনকে এই থিয়েটারে টেনে এনেছিলেন। যেমন গঙ্গামনির হাত ধরে এসেছিলেন বিনোদিনী আবার বিনোদিনীর হাত ধরে এসেছে তারাসুন্দরী। তাদের টিকি বাবুদের কাছে বাঁধা থাকলেও তারা বুঝতে পেরেছিলেন থিয়েটারই হলো একমাত্র জায়গা যেটা তাদেরকে কিছুটাও হলেও জাতে তুলবে। সামান্য হলেও সম্মান এনে দেবে। আর এভাবেই হয়েছিল তখনকার দিনের নারীর ক্ষমতায়ন। পিতৃ পরিচয়হীন হওয়ার জন্য স্বাভাবিক কারণে এই নারীদের কারোরই পদবী ছিল না। ব্যতিক্রম সুকুমারী দত্ত । থিয়েটারের সূত্রে তার বিয়ে হয়েছিল থিয়েটারেই গৌরীশংকর দত্তের সঙ্গে। আবার তার আসল নাম গোলাপি হলেও সুকুমারী চরিত্রে দিনের পর দিন খুব ভালো অভিনয় করার জন্য নামটা আর গোলাপি থাকে না । পরিবর্তিত হয় সুকুমারিতে। আলোচনায় ইতিহাসের এরকম অনেক আকর্ষক ও গুরুত্বপুর্ন বাঁকের কথার মাঝে উঠে আসে অভিনয়ে বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে মিশে গিয়ে নটী বিনোদিনীর
দুর্দান্ত প্রতিভার স্ফূরণের কথা।পাশাপাশি তাঁর কবিতা লেখা থেকে নিজের আত্মজীবনী ‘আমার কথা ‘ লেখার কথাও।তেমনি থিয়েটারের ইতিহাসে ১৮৭০ সালে সুকুমারি দত্তের হাত ধরে নারী চরিত্রে একজন নারী হিসাবেই সর্বপ্রথম অভিনয়ের কথা। সেই সঙ্গে থিয়েটারের ইতিহাসে সুকুমারী দত্তই প্রথম নারী যার হাত দিয়ে ‘অপূর্ব সতী ‘ নামে নাটক বেরিয়েছিল। একইভাবে আলোচনায় উঠে এলো তারাসুন্দরী কবিতা চর্চার কথা। শুধু তাই নয় চারপাশের সব বাধা কাটিয়ে এই তারাসুন্দরীর থিয়েটার দেখতে এসেছিলেন মা সারদা দেবী। সেই সূত্রে এই তারাসুন্দরীরও যাতায়াত ছিল সারদা মায়ের বাড়িতে। অস্পৃশ্য হিসাবে মা সারদা তাঁকে দূরে সরিয়ে দেন নি।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো দর্শক শ্রোতারা শুনলেন শিশির বাবুর টানা দেড় ঘণ্টার একক আলোচনা। তারপর চললো প্রশ্নোত্তরের পালা। মনে হচ্ছিল আরো এক দুই ঘণ্টা চুপচাপ বসে শোনা যায়। তমলুকে প্রথম বার সমরেশ বসুর শতবার্ষিকীর উপর, দ্বিতীয়বার বন্দেমাতরমের দেড়শত বছরের উপর এবারে থিয়েটার নিয়ে শুনলাম শিশিরবাবুর কথা। কোনোটাই শুনতে কোথাও কোনো ক্লান্তি নেই। আছে অজানা ইতিহাসের বহু গুরুত্বপুর্ন বাঁকের কথা। আবার কোথায় শোনার সুযোগ পেলে দেখা হবে।খুব ভালো থাকবেন Shishir Roy

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *