দাও ফিরিয়ে সেই পঁচিশে বৈশাখ
সান্ধ্য আজকালে প্রকাশিত
“দাও ফিরিয়ে সেই ২৫শে বৈশাখ”
গ্রামের কোনো বনেদি বাড়ির বড়ো বারান্দা। তাতে একটা বা দুটো চৌকি ফেলে স্টেজ। না হলে তিন চারটা চৌকি পাড়ার বিভিন্ন বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে হাতে হাতে ধরি ধরি করে পাড়ার খেলার মাঠে এক পাশ জুড়ে ফেলা। তাতেই স্টেজ। এরপর যে যার বাড়ি থেকে এক রঙের শাড়ি এবং ধুতি জোগাড় করা। তা দিয়েই স্টেজের কাঠামোকে সাজিয়ে তোলা এক নাট্যমঞ্চে। কখনো কখনো পাড়া থেকে সংগ্রহ করা বিছানার চাদর দিয়ে তৈরি হতো স্ক্রিন। তা খোলা আর বন্ধের জন্য নিদির্ষ্ট থাকতো দু তিন জন ছেলে। রাতে জ্বলে উঠতো হ্যাচাকের আলো। মাইক কখনো থাকতো কখনো নয়। যদি বা আনা যেতো অনেক সময় রিকশা ভাড়ার অভাবে সাইকেলেও বয়ে নিয়ে আসতে হতো আয়োজকদের । তারপর শুরু হতো “ফান শন”। মঞ্চে দাঁড় করানো হতো বাঁধানো রবীন্দ্রনাথের ছবি। কোথাও তা না পাওয়া গেলে রবীন্দ্রনাথের বড়ো ছবি যুক্ত ক্যালেন্ডার। যা তখন সহজে পাওয়া ও যেত। পয়লা বৈশাখের নতুন বাংলা ক্যালেন্ডারে তা থাকতই।শুরু হতো আবৃতি দিয়ে। তাতে থাকতো প্রশ্ন, পুরাতন ভৃত্য, পূজারিনি, দেবতার গ্রাস, নিস্কৃতি, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ আরও অনেককিছু। কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ী ও বাদ যেত না। থাকতো আয় তব সহচরী, এসো হে বৈশাখ, খর বায়ু বয় বেগে র মতো গান, নৃত্যনাট্য। গানের সরঞ্জামের জন্য দু চারটা বিশেষ বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হতো হারমোনিয়াম। তবলা কখনো থাকতো কখনো বা নেই। যদি থাকতো তবলজি হিসাবে এক দু জন ই পরিচিত মুখ । গরমে ঘেমে যার ঘাড়ের থেকে ফুটে বেরোতো পাউডার। মাথায় অল্প টাক। ছোটদের সাজানো হতো পাড়া থেকে সংগ্রহ করা বেল, বকুল কখনো বা রজনীগন্ধ্যা ফুল দিয়ে। আর এই কাজটা নিপুন ভাবে বেশ উৎসাহের সঙ্গে করতো পাড়ার দিদিরা। সাজলে কেউ হয়ে যেতো অমল, কেউ দইওয়ালা, কেউ সুধা, কেউ কর্ণ আর কেউ বা কুন্তী এই রকম সব রবীন্দ্র চরিত্র। তাতে কিন্তু অমল বা কর্ণকে ছেলেই হতে হবে তার কোনো মানে ছিলো না। যার গলায় যে চরিত্র মানাতো তাকেই সেই চরিত্র দেওয়া হতো। এভাবেই কাটতো সন্ধ্যে থেকে গভীর রাত। পরদিন আবার চৌকি, সারি,ধুতি,বিছানার চাদর সব যে যার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। হ্যাঁ, এ সবই ছিল
৩০,৪০,৫০বছর আগেকার গ্রামের ২৫ শে বৈশাখের ছবি।
এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আজও বিহ্বল হয়ে পড়েন বিকাশ মুখোপাধ্যায়, কাকলি লাহা , সুজাতা মাইতি বা নন্দগোপাল পাত্ররা। মধ্য ষাটের অবসর প্রাপ্ত ব্যাংক অফিসার বিকাশ বাবু আজও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। তিনি বললেন” সেই ষাটের দশকে তাদের গ্রামের বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙ্গার কাছে খাটুরি গ্রামে প্রতি বছর এ ধরনের অনুষ্ঠান হতো। ২৫ শে বৈশাখের সেই নির্মল সকালে শুরু হতো প্রভাত ফেরী। তাতে পা মেলাতো ছোটো বড়ো অনেকেই। কারো কারো হাতে থাকতো রবীন্দ্র নাথের ছোটো ছোটো ছবি। আর সবাই কিন্তু গলা মেলাতেন ‘আগুনের পরসমনি ছোঁয়াও প্রাণে’তে। প্রতিবছর এই গানটা ছিল বাঁধা। আর এই এ গান গেয়ে গেয়ে পথ পরিক্রমা, সে যেন এক অপার আনন্দ। আজও বলতে গেলে গায়ে কাঁটা দেয়। প্রভাতফেরীর শেষে পাওয়া যেত টিফিন। পাড়ার কারোর ঘরে তৈরি হওয়া পরোটা, আলুরতরকারি আর বোঁদে। কোনো কোনো বছর পাওয়া যেতো দানাদার। আর সন্ধেতে শুরু হতো’ ফান শান’। বাবার পুলিশের বদলির চাকরির সূত্রে বাংলার বহু গ্রাম শহর, শহরতলি ঘুরে বেড়িয়েছেন কাকলি লাহা। তিনিও আজ ভুলতে পারেন না তার সেই ছোট্টবেলার ২৫ শে বৈশাখের দিনগুলোকে। প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক যেখানেই থেকেছেন সেখাকেই দৌড়ে গেছেন আবৃত্তি, গান বা নাটকে অংশগ্রহণ করতে। বিষ্ণুপুরে থাকার সময় তার প্রিয় সুকুমার স্যারের সাইকেলে চেপে এদিক ওদিক দৌড়ে যেতেন। কখনো নিজে অংশগ্রহণ করতে কখোনো বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখতে। সেই দিনের বন্ধুদের মধ্যে সুদীপ চ্যাটার্জী বা তনুকারা আজ কেউ নাটকের দলে ,কেউ বা আবৃত্তিতে ও অনুষ্ঠান সঞ্চালনাতে নিয়োজিত। আর পূর্বামেদিনপুরের প্রতন্ত্য গ্রাম বেতার মেয়ে সুজাতার আবার এই দিনে স্কুলের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে বাঁধা ছিল ‘কর্ণ- কুন্তী সংবাদ ‘ অভিনয় করে দেখানো। ধুতি পাঞ্জাবী পরে কর্ণ সাজতো সে। দশম শ্রেণী পর্যন্ত্য এই অভিনয় তার বাঁধা ছিলো। কিন্তু আজ? তারা আজও ডাকঘরের অমলের বা কর্ণের সংলাপ এক নিঃশ্বাসে বলে যেতে পারলেও তাদের পুত্র কন্যা, নাতি নাতনিরা সেভাবে আর ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠান আয়োজন করে না। তারা এতে উৎসাহ ও পায় না বলে একবাক্যে এরা স্বীকার করছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বললেন শিক্ষক নন্দগোপাল পাত্র। তাঁর কথায় ” আগেকার দিনে পড়ানোর সময় রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতা কোন কাব্যগ্রন্থ্য থেকে নেওয়া হয়েছে তা বললে ছাত্র ছাত্রীরা ও সেটার প্রতি উৎসাহ দেখাতো। কেউ কেউ সেটা জোগাড় করে পড়ার চেষ্টা ও করতো। আর আজ একজন সে রকম ছাত্র পাওয়া স্বপ্নের ব্যাপার হয়ে গেছে। এখনতো পড়াশোনা তো কিছু তথ্য জোগাড় করে তা উগরে দেওয়া। এর সঙ্গে জ্ঞানের স্বম্পর্ক থাকুক আর না থাকুক। হয়তো এর জন্য আমরাই দায়ী।”
————-0—————-0————–0————0————-
সুদীপ মাইতি
