লোকাল ট্রনের কামরায় ‘ সুমধূর’ দ্যাম্পত্য কথোপোকথন।
যাচ্ছিলাম দীঘা- সাঁতরাগাছি লোকালে। হাওড়ার সাঁতরাগাছি স্টেশনে নেমে দ্বিতীয় হুগলি সেতু পেরিয়ে ভালোবাসার রাজধানী শহর কলকাতাতে। মাঝে মাঝে যেতে হয় কাজে। যদিও বাড়ির লোকের ভাষায় ‘অকাজে’। কাঁথি থেকে 6- 22 মিনিটের লোকালে যেতে ভালো লাগে। দুপাশে কখনো ধূ- ধূ মাঠ, কখনো বা সবুজে ভরা ধানক্ষেত, আবার কখনো হলদে হতে থাকা ধান গাছের শীর্ষে সোনালী টেউ। রেলপথের দু পাশে বছরভর পাল্টে যাওয়া প্রকৃতি দেখতে দেখতে কখন যে গন্তব্যে পোঁছে যাই তার খেয়াল থাকেনা। আবার ট্রেনের মধ্যেও দেখতে পাওয়া যায় কিছু কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রানবন্ত দৃশ্য বা কথোপকথন । সৈকত শহর দীঘায় দু একদিন হুটাপাটা সেরে ক্লান্ত হয়ে ট্রেনে উঠে চাদর মুড়ি দিয়ে ট্রেনের সিটে লম্বা হয়ে ঘুম। বা ছোটো ছোটো কচি কাচাদের প্রথম সমুদ্র দর্শনের বনর্নার কলকলি শুনতে শুনতে ভ্রমন মন্দ লাগে না। তাই এই ট্রেন যাত্রাটা উপভোগ করি। আর একটা কারন ও আছে। সেটা চুপিচুপি বলি। কাঁথি থেকে হাওড়া ট্রেন ভাড়া 35 টাকা। কিন্তু মুহুমুহু ছুটে চলা হাওড়া- কলকাতাগামী বাসে কাঁথি থেকে ভাড়া 100 টাকা । সময় একই লাগে। আবার এই ট্রেনটা গ্যালোপিন ও বটে। তবে দীঘা থেকে পাঁশকুড়া পর্যন্ত লোকাল। পাঁশকুড়া থেকে গ্যালোপিন। পাঁশকুড়ার পরে ভোগপুর, মেছেদা, বাগনান উলুবেড়িয়া সাঁতরাগাছি ।
কয়েকদিন আগে এক রবিবার চলেছি এই ট্রেনে। ট্রেন পাঁশকুড়া মেছেদা ছাড়িয়েছে । রূপনারায়ণ নদীর উপর কোলাঘাট সেতু ও ছাড়িয়ে হুহু করে এগোচ্ছে। আমিও একটি গল্প বইতে ডুবেছি। ট্রেনটা বাগনান স্টেশনে দাঁড়ালো। এক দম্পতি তাদের চার পাঁচ বছরের ছেলে নিয়ে আমার সামনের সিটে এসে বসলো। শুরু হলো তাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বা “স্বাভাবিক কথোপকথন “। সুন্দরী স্ত্রী শুরু করলেন এভাবে। ” তুমি এই ট্রেনে উঠলে কেনো? জানো না এটা সাঁতরাগাছি স্টেশন পর্যন্ত যাবে? আর আমাদেরতো হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত যেতে হবে।” এই কথায় স্বামীর কোনো হেলদোল নেই দেখে আবার একটু ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল ” কোনো কথার গুরুত্ব নেই যেনো।” এটা শুনে স্বামী ছেলেকে জানালার দিকে ডেকে বাহিরে দৃশ্যমান প্রকৃতি দেখার সুযোগ করে দিলো। তার কিছু বর্ননাও দিলো। তারপর বাহিরের আকাশের দিকে ভাবলেশহীন ভাবে স্ত্রীর প্রশ্নের উত্তরে বলল ” কি হয়েছে তাতে? সব সময়ই তো লোকাল ট্রেনে ভীড় ঠেলে যাতায়াত করো। ফাঁকা গ্যালোপিন ট্রেনে চড়ে দেখো। কি রকম লাগে।” ভদ্রলোকের ভাবলেশহীন উত্তর ও উত্তরের মধ্যে শ্লেষ দেখে ভদ্রমহিলার বোধহয় ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। আরোও ঝাঁঝিয়ে বলে উঠলেন ” আমাকে লোকাল, গ্যালোপিন দেখিও না। আমার বাবা রেলে চাকরি করতো। সব সময় সুপারফাষ্ট , এক্সপ্রেস ,রাজধানী, শতাব্দী তে চড়ে সারা ভারত ঘুরে বেড়ায়েছি। তোমাদের এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে না এলে লোকাল ট্রেন ব্যাপারটাই বুঝতাম না। ” এরই মাঝে ট্রেন উলুবেড়িয়া স্টেশন ছাড়ালো। এর পর একদম সাঁতরাগাছি । স্ত্রীর এই ঝাঁঝালো উত্তরে একটু বিচলিত হলেন মনে হলো ভদ্রলোককে। তবে হাল ছাড়লেন না। বললেন ” জানি জানি । তোমার বাবা বিনেপয়সার সুযোগ পেতেন তাই ভারত ভ্রমন করিয়েছেন । নাহলে নিজের পয়সায় ! রিক্সা করে যতটা হয় হতো আর কি। সেতো তোমার মা ই বলেন কোনো একদিন একটা সখে ট্যাক্সিও চড়ায়নি। যা কিপ্টে । তাও আমিতো তোমাকে আকাশ পথে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আন্দামান জেল দেখিয়ে নিয়ে এসেছি।” শ্বাশুড়ির নাম করে বাবাকে যে কিপ্টে বলল তার স্বামী সেটা বুঝতে বাকি থাকলো না কারোরই। আর বাবা তুলে কিছু বললে কোন মেয়ে আর কোনদিন সহ্য করেছে! তবু চারপাশটা চোখ বুলিয়ে নিলো একবার। কোমর বেঁধে নামার আগে। আমি কিছুই দেখিনি কিছুই শুনিনি ভাব নিয়ে গল্পের বইয়ের পাতায় সদ্য শোনা কথাগুলো খোদাই করছি। আর পরবর্তী নাটকের অপেক্ষায় রয়েছি। এরপর ভদ্রমহিলা তার ক্ষুরধার যুক্তি নিয়ে মাঠে নামলেন। বললেন” তোমার মতো বোকা গাইঁয়া বলে এ ধরনের কুরুচিপূর্ন কথা বলছ। না হলে এই ট্রনে উঠতে না। এই ট্রেন সাঁতরাগাছিতে এক বা দু নম্বরে থামবে। সেখান থেকে হাওড়ার ট্রেন ধরতে পাঁচ নম্বরে আসতে হবে অনেকটা ওভারব্রীজ পথ পেরিয়ে । তাড়াতাড়ি তো হবেই না । উল্টে হাওড়া পৌঁছতে দেরি হবেই। পারলে আমার বাবার সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে কিছু বুদ্ধি উপার্জন করো।নাহলে এই রকম বোকা, হাঁদা, গাইঁয়া হয়ে এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে পড়ে থাকতে হবে। কলকাতায় রাত কাটানোর জন্য নিজের কোনো আস্তানা তোমার দ্বারা এ জন্মে হবে না।” ভদ্রলোক কিছু একটা বলতে গিয়ে থমকালেন। ট্রেনটাও আস্তে আস্তে বাউড়িয়া স্টেশনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলো। দাঁড়ানোর কথা নয়। বোধহয় সিগন্যাল পায় নি। এবার ভদ্রলোক বললেন” চলো , এখানে নেমে পড়ি। পরের লোকাল ধরে হাওড়া স্টেশন । আর তোমাকেও এই বপু নিয়ে সাঁতরাগাছি স্টেশনের ওভারব্রিজ পেরোতে কষ্ট করতে হবে না। ভদ্রমহিলা এর উত্তর ট্রেনে থাকাকালিন দিতে পারেননি । নেমে কি দিয়েছেলেন শুনতে পাই নি। ততক্ষনে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিলো। আপনারা কেউ শুনে থাকলে আমাকে জানাবেন।