নব্বইয়ের যুবক ডঃ নিতাই চন্দ্র মন্ডল
।। নব্বইয়ের যুবক ড. নিতাই চন্দ্র মণ্ডল।।
নয় তারিখ বেলা এগারোটার নাগাদ পৌঁছেছিলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। মোড়ে টিফিন আনতে এবং আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে তিনি তখন দাঁড়িয়ে সল্ট লেকের একটি অটো স্ট্যান্ডে। ফ্ল্যাটে প্রবেশের পর কথায় কথায় বেলা এগোতেই বললেন টিফিন খেয়ে নাও। তুমি তো ভাত খাবে না বললে। তাই টিফিন।আমার তরকারি করা আছে। প্রেসার কুকারে একটু ভাত বসিয়ে দেই। বললাম একসঙ্গে খাবো। তবে যদি কিছু না মনে করেন একটু চাল বেশি নিয়ে নিন।যেন ঘুগনি, কেক, পেষ্টি জাতীয় টিফিন আর ভাত একসঙ্গে খাওয়া হবে। বললেন মাছের তরকারি আছে। অসুবিধা নেই। তবে আগে বললে তোমার জন্য আলাদা একটা মাছের প্রিপারেশন করতাম। যাই হোক একা হাতে ভাত রান্না, তরকারি গরম, শসা, লেবু , কাটা সহ ভাত থালায় সাজিয়ে দিলেন তিনি। ছিল বাঁধাকপির তরকারি; কাঁকরোল, গাজর, পটল, ক্যাপ্সিক্যাম, কাঁঠালের বিচি, দু এক পিস আলু দিয়ে পোনা মাছের তরকারি; আনারসের চাটনি, সঙ্গে টক দই। ওহ ছিল বাজার থেকে আনা গুগনিও। বললেন বোসো বসো বেলা হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। দুপুরে খাওয়া জুটলো কিনা খোঁজ নেওয়ার জন্য। বললাম হ্যাঁ রেডি হচ্ছে। আর করছেন নব্বই ছুঁই ছুঁই এক ‘ যুবক ‘ । ওপার থেকে উত্তর এলো দেখে এসো , শিখে এসো। যুবক শুনে বললেন তোমার তাহলে বিপদ হয়ে গেলো , বলো! ‘
তুলনাহীন খাওয়া সেই সঙ্গে গল্পতো হলো।এবার আসি সেই যুবকের প্রসঙ্গে। যুবকের নাম Dr Nitai Mandal । তিনি প্রথিতযশা বিজ্ঞানী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন ও বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশোনা করার পর আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষণা, পোস্ট ডক্টরেট করেছেন আমেরিকায়, অধ্যাপনা ও গবেষণায় যুক্ত থেকেছেন সেই বসু বিজ্ঞানে । পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও উপাধি।ভারতের বহু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ বিভিন্ন বিজ্ঞান সেমিনারে অজস্রবার অংশগ্রহণ করেছেন, বলা ভালো এখনও করে চলেছেন। বহু গবেষণা পত্র সহ বিজ্ঞানের বহু প্রবন্ধ লেখালিখির মধ্যে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার লক্ষ্যে বেশ কিছু বই লিখেছেন। লিখেছেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে নিয়ে, জগদীশ চন্দ্র বসুকে নিয়ে, করোনা ভাইরাস নিয়ে, বসু বিজ্ঞান মন্দির নিয়ে এরকম বেশ কিছু তো রয়েছেই। রয়েছে ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের উপর ইংরেজিতে লেখা History of Science in India : volume 8 ।
লিখেছেন ‘বার্ধক্যের আঙিনায় ‘ বলে একটি বই। দশটি পরিচ্ছেদে যেখানে রয়েছে শরীরের প্রায় সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাজ, তার পরিচালনা, শরীরের শত্রু ও সেগুলির বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বার্ধক্যের কার্য কারণ এবং বার্ধক্যের বিভিন্ন অসুখ নিয়ে তিনশত পৃষ্ঠার একটি বই।
অথচ এই পথ চলার শুরুটা কোনো অর্থেই মসৃণ ছিল না।১৯৩৮ সালে মেদিনীপুরের ডেবরা থানার অন্তর্গত কাঁসাই নদীর পাড়ের কাছাকাছি মধুবনপুর নামে এক অজ পাড়াগাঁয়ে তাঁর জন্ম। ঘটনাচক্রে এ গ্রামের পাশেই সেই কাঁসাই নদীতে কখনও কখনও প্যান্ট গুটিয়ে কখনও বা নৌকা করে কখনও বা বাসে চেপে পেরিয়ে পৌঁছাতাম গোলগ্রাম বলে একটি জায়গায়। যেখানে ইউনাইটেড ব্যাংকে বছর আগে কাজ করেছি।
স্কুলে পড়া থেকেই মাস্টার ডিগ্রি করা পর্যন্ত নিতাই মণ্ডলকে ধান রোপণ, ধান কাটা থেকে মাথায় ধান বস্তা নিয়ে ধান বিক্রি করতে যাওয়া ছিল বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় করার রাস্তা। এই পথে এগোতে এগোতে ডিগ্রি কোর্সে পরীক্ষা দিয়েই স্কুলে মাস্টারি করতে ঢুকে পড়তে হয়েছে। বাড়ির কাজের অসুবিধার জন্য দেখা নেই শোনা নেই বাড়ির বাধ্য ছেলের মতো বাড়িতে কাজের প্রয়োজনে কনে দেখতে গিয়ে সেইদিনে সেখানেই বিয়ে করে ফিরতে হয়েছে ওই স্নাতক হওয়ার বছরেই। তারপর বাড়ির সবার প্রয়োজন মেটাতে কখনও স্থানীয় পাঁসকুড়া কলেজ চাকরি কখনও গবেষণার কাজে পাওয়া পয়সা দিয়ে সংসার প্রতিপালন। সঙ্গে টিউশনিতো ছিলই।
না এই লড়াইয়ের ইতিহাস এতো সংক্ষিপ্ত নয়। কিন্তু আজও সেই পথকে না ভুলে প্রাক্তনী হিসাবে সেই প্রাথমিক, সেই মাধ্যমিক স্কুল , সেই মেদিনীপুর কলেজ সহ বিভিন্ন জেলা ,কলকাতা সহ বহু স্কুল কলেজে আজও শিক্ষা প্রসারে বিশেষত বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারে পরিকল্পনা দিয়ে অর্থ সহযোগে বহুভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকছেন। যার সঠিক হিসাব তিনি মনে রাখেন নি। সেদিন বলছিলেন বহুদিন ধরে যুক্ত থেকে দেখছেন বিজ্ঞানের এই অগ্রগতির যুগে শিক্ষা বিস্তারে কম বেশি রাজনীতিক হস্তক্ষেপের পাশাপাশি সরকারগণের সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া। অন্যদিকে যাদবপুরের একজন প্রথিতযশা রসায়ন বিজ্ঞানীকে যেভাবে অবোধের মতো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তাতে তিনি প্রচণ্ড বিস্ময় প্রকাশ করে এ কথা উল্লেখ করে আজ বললেন এ আমরা কোথায় চলেছি?
প্রণাম নেবেন নিতাইদা। আবার যাবো একদিন।







