রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মহেনজোদারো সম্পর্কে
সিন্ধি ভাষায় মহেন শব্দটির অর্থ মৃত। জো- দারো মানে স্থান। অর্থাৎ মহেন – জো – দারো কথাটির অর্থ মৃতের স্থান বা মৃতের ঢিবি। ইংরেজিতে যা মাউন্ড অফ দি ডেড । ১৯২২-২৩ সালে এই মৃতের ঢিপি বা মৃত সভ্যতার বয়স আবিষ্কার করে সারা পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলেন বিখ্যাত ইতিহাস ও প্রত্নতত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তাঁর গভীর প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টি দিয়ে ভারতীয় সভ্যতা তথা সিন্ধু সভ্যতাকে মিশর, গ্রিস, ব্যাবিলন,সুমেরুর মতো সুপ্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে একই আসনে বসিয়ে দেন। যদিও ১৯২২-২৩ সালের তাঁর এই নিজস্ব আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে ইউরোপের সেই স্বীকৃতি পায় নি। কারণ তাঁর উপরওয়ালা জন মার্শাল। যিনি আজ থেকে একশত বছর আগে ১৯২৪ সালে যেটা প্রচার করতে সমর্থ হন সেটা হলো স্যার জন মার্শালের নির্দেশক্রমে এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। যেখানে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অধীনস্ত এক আধিকারিক মাত্র। আশ্চর্যের বিষয় এই যে জন মার্শাল কিন্তু মহেন – জো – দারো র মাটিতে প্রথম পা রেখেছিলেন ১৯২৫ সালে।
অন্যদিকে রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ১৯২৫ সালে জানুয়ারি মাসে মাসিক বসুমতী পত্রিকায় লিখছেন,” মহেন জো দারো সিন্ধুপ্রদেশের উত্তর বিভাগে লারকানা জিলার লবদরিয়া তালুকের মধ্যে অবস্থিত একটি প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষের নাম। এই নগরের অস্তিত্বের কথা অনেকেই জানতেন, কিন্তু কেহই পূর্বে এই স্থান খনন করিতে চেষ্টা করেন নাই।কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শাস্ত্রের অধ্যাপক শ্রীযুত দেবদত্ত ভান্ডারকার যখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে চাকরি করতেন , তখন ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি একবার মাহেন জো দারোর নিকটে পৌঁছিয়াছিলেন।সরকারি কার্যবিবরণীতে দেখিতে পাওয়া যায় যে, অধ্যাপক শ্রীযুত দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভান্ডারকর মতে মহেন্ – জো –
দারো নগর প্রাচীন নহে, আন্দাজ ২/৩ শত বৎসরের পুরনো। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাস হইতে আমি সিন্ধুনদের পুরাতন খাদ অন্বেষণ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম।”
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই খনন কার্যের রিপোর্ট ইংরেজ সরকার প্রকাশ করে নি। তাঁর মৃত্যুর ৫৪ বছর পরে ১৯৮৪ সালে বেনারস থেকে ‘Mohenjodoro A Fogotten Report ‘ নামে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে এটি প্রকাশিত হয়। মহেন – জো – দারোর প্রাচীনত্ব আবিষ্কারের জন্য তাঁর নাম ইংরেজ সরকার তথা স্যার জন মার্শাল যে প্রচারে আনবেন না তা তিনি তখনই বুঝতে পেরে বন্ধু সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে e বিষয়ে অবগত করেছিলেন। সুনীতিবাবু এই প্রসঙ্গে লিখেছেন,” দ্যাখ সুনীতি, এরা তো আমাকে মহেন – জো – দারো সমন্ধে কিছু প্রকাশ করতে দেবে না। এ সমন্ধে তোর কিছু লিখতে বাধা নেই। আমি তোকে সমস্ত মাল- মসলা দিচ্ছি, তুই এই বিষয়ে কিছু লেখ আর এ সমন্ধে আমার যা ধারনা তাও তুই প্রকাশ করে দে। এইভাবে ভবিষ্যতের জন্য একটা রেকর্ড থাকুক।’ এরপর সুনীতিবাবু ১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় Dravidian Origins and Beginging of Indian Civilization নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন।
মহেন- জো – দারো স্থানটি তৎকালীন নর্থওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলপথের রোহরি – কোটারি শাখার ডোকরি স্টেশন থেকে ছয় মাইল দূরে অবস্থিত। বহু দূর থেকেই মহেন জো দারোর উঁচু ঢিবি দেখা যেত। খননের ফলে মৃতের শহর আবার জেগে ওঠে।এরপর সেই লেখায় মিশরীয় সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতার যোগসূত্র বোঝাতে গিয়ে রাখালদাস লিখেছেন “সিন্ধুদেশেও মিশর দেশের নীলনদের মতো সিন্ধুনদ একটি মাত্র নদ । ইহার পূর্ব দিকে বিকানিরের এবং পশ্চিমদিকে বালুচিস্থানের মরুভূমি। আমি যে ৭ বৎসর বোম্বাই প্রদেশে ছিলাম, সেই ৭ বৎসর প্রত্যেকবার শীতকালে সিন্ধুপ্রদেশের এই মরা নদী জরিপ করিয়া ২৩ টি প্রকান্ড ও ৫৫ টি ছোটো নগরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করিয়াছি ।”
আবার সেই সভ্যতার প্রাচীনত্ব আবিষ্কারের প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,” ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে লারকানা জিলার পশ্চিমাংশে গৈচিডেরো নামক স্থান পরিদর্শনকালে দেখিতে পাওয়া গেলো যে একটি বড়ো বাড়ি ভাঙিয়া অনেকগুলি বড়ো বড়ো মাটির জালা বাহির হইয়া পড়িয়াছে। তাহার মধ্যে একটি জালার ভিতরে হাত দিতেই আমার একটি আঙ্গুল কাটিয়া গেল। সকলেই বলিল যে উহার ভিতরে সাপ আছে এবং তোমাকে সাপে কামড়াইয়াছে। হাত বাঁধিয়া সাপ মারিবার জন্য জালা ভাঙিয়া দেখা গেল যে, সাপের পরিবর্তে জালার ভিতরে ১০ টি মাটির ভাঁড় তিন থাকে সাজানো আছে। উপরের থাকের একটি মাটির ভাঁড়ের মুখে একখানি ছোটো পাথরের ছুরি আছে, যে ছুরিতে লাগিয়া আমার আঙুল কাটিয়া গিয়াছিল। প্রত্যেক মাটির ভাঁড়ের মধ্যে মানুষের দেহের একখানি অস্থি এবং সেই অস্থির চারিপার্শ্বে তিন বা চারি থাকে খুব ছোটো ছোটো ভাঁড়ে ধান, যব, গুড়, তামাক, অলংকার, কাঁচের বাসন, কাঁচের পুঁতির মালা এবং পাথরের অস্ত্র সাজানো আছে। এই আবিষ্কার করিয়া বুঝিলাম যে, সিন্ধুনদের দক্ষিণভাগে যে সমস্ত ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে, উত্তরভাগের ধ্বংসাবসেগুলি সে জাতীয় নহে।”
এই খনন কার্যে বিভিন্ন চিত্রাক্ষর (pictogram) ও মুদ্রা ও কিছু পাথরের সিলমোহর আবিষ্কৃত হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন” এখন প্রমাণ হইয়াছে যে, প্রাচীন সিন্ধুদেশের অধিবাসীরা যে সমস্ত চিত্রাক্ষর (pictogram) ব্যবহার করিত , বাবিলনিয়ার প্রাচীনতম অধিবাসী প্রাচীন সুমেরীয় জাতি যিশুখ্রিষ্ট জন্মিবার ৩ হাজার ৫ শত বৎসর পূর্বে সেইরূপ চিত্রাক্ষর ব্যবহার করিত। বাবিলনিয়ার প্রাচীন অধিবাসীগণ জলপ্লাবন হইতে মন্দিরগুলি রক্ষা করিবার জন্য এইরূপ উচ্চ ইষ্টকের পোস্তা তৈয়ারি করিয়া তাহার উপরে দেবমন্দির নির্মাণ করিত। সেই সঙ্গে তিনি এও লিখেছিলেন ” এখানে আবিষ্কৃত তামার পয়সা ইহার পূর্বে ভারতবর্ষে আর কোথাও পাওয়া যায় নাই। এবং মহেন জো দারো খননের পরে বুঝিতে পারা গেল যে , অতি প্রাচীনকালে অর্থাৎ যীশুখ্রিস্টের জন্মের ৩ হাজার বা ৪ হাজার বৎসর পূর্বে সিন্ধুদেশে চিত্রাক্ষর ব্যবহার হইত, তখন সিন্ধুদেশবাসীরা সর্প দেবতার পূজা করিত।”
আসলে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্রাবস্থা থেকেই প্রত্নতত্ত্বের অন্যান্য শাখায় যথা স্থাপত্যকলা(architecture) , মুদ্রাতত্ত্ব (numismatics), মূর্তিতত্ত্ব(iconography) লেখতত্ত্ব(epigraphy ) সহ প্রাচীন ভারতীয় লিপি ব্রাহ্মী, খরোষ্টি ইত্যাদির নিবিড় ব্যবহারিক পাঠ নেন ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহের ভারপ্রাপ্ত অধীক্ষক ,প্রত্নতত্ববিদ ও প্রাচীন ভারতীয় লিপি বিশেষজ্ঞ ডঃ থিওডর ব্লখের সন্নিকটে।একই সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের সংস্কৃত ও পালি বিভাগের প্রধান উনবিংশ শতাব্দীর প্রাচ্যতত্ত্বের মহান আচার্যের মহামোহপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সন্নিকটে আরো অনেক বিষয়ের সঙ্গে প্রাচ্যবিদ্যার তাত্ত্বিকদিক সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন। এছাড়া প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষক টমাস এইচ হল্যান্ডের কাছে জীবাশ্ম সম্পর্কিত পাঠ তাঁর প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো ক্ষুরধার করে তুলেছিল।
তাই তিনি শুধু মহেন – জো – দারো নয় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় ক্ষেত্রের অস্থায়ী(বদলি বা officiating ) অধিক্ষক হিসাবে ১৯২০ সালে তাঁর নেতৃত্বে আবিষ্কৃত হয় চান্দ্রেহি, দুধিয়া, বৈজনাথ, গুর্গী, দেওতালাও, অমরকণ্টক, সোহাগপুর, অমরপতন, মোশন ইত্যাদি প্রত্নস্থল। আবার ১৯২৪ সালে পূর্বাঞ্চলীয় চক্রের স্থায়ী অধীক্ষক হিসাবে বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার পাহাড়পুর গ্রামে ‘সোমপুর মহাবিহার ‘ উৎখনন সহ বর্ধমান, বাঁকুড়া, রংপুর, ঢাকা, দিনাজপুর, রাজশাহী প্রভৃতি এলাকায় ইতিহাস আবিষ্কার সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রানুসন্ধানের তিনি কাজ করেছিলেন।
রাখলদাস বন্দ্যোপাধ্যাযের লেখতত্ত্ব(epigraphy )এর উপর দখল এতটাই ছিল যে মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি দেশের সামনের সারির লেখতাত্ত্বিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।সেই সঙ্গে মুদ্রাতত্ত্ব (numismatics) বিষয়েও তার স্বীকৃতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এতটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে অস্ট্রেলিয়ান মুদ্রার পাঠোদ্ধার করতে তার কাছে যেমন মুদ্রা এসে পৌঁছেছিল তেমনি আফগানিস্থানের আমিরও এশিয়াটিক সোসাইটির মাধ্যমে গবেষণার জন্য তাঁকে কিছু মুদ্রা পাঠিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে মুদ্রাতত্ত্ব ক্ষেত্রে তাঁহার বিরাট অভিজ্ঞতা হইতে তিনি ‘প্রাচীন মুদ্রা ‘ নামক বাংলা ভাষাতে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। যা ভারতীয় ভাষাতে রচিত সর্বপ্রথম মুদ্রাতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থ। পরে তাহা হিন্দিতেও অনূদিত হয়।
লেখালিখির ক্ষেত্রে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ছাত্র অবস্থা থেকেই ইতিহাস আশ্রিত বহু গুরুত্বপুর্ন লেখা শুরু করেন।বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ , এশিয়াটিক সোসাইটি,ভারতী, বঙ্গদর্শন নব পর্যায়, আর্য্যাবর্ত, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, প্রবাসী, ভারতবর্ষ, প্রাচীন ভারত, আনন্দবাজার পত্রিকা, বাসন্তী নব পর্যায়, মাসিক বসুমতী, সহ বহু খ্যাতনামা পত্রিকা ও জার্নালে তাঁর লেখা বেরোতে শুরু করে এবং তা গুণী জনেদের দ্বারা স্বীকৃতি লাভ করে।
***
একদিকে তাঁর সব খনন কার্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ যেমন সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ করেছেন তেমনি বহু ইতিহাসের বই ও ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস তিনি রচনা করেছিলেন।ইতিহাসের বইয়ের মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য হলো দুই খন্ডে বাংলার ইতিহাস ও উড়িষ্যার ইতিহাস। তাঁর লেখাগুলি এতটাই প্রয়োজনীয় এবং সুপাঠ্য যে এগুলি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি ইংরেজি ভাষায় বহু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী রচনা করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সংগ্রহশালায় রক্ষিত তাম্রশাসনগুলির একটি আনুপূর্বিক বিবরণীর catalogue of Inscritions on copper plates in the collection of asiatic society, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহকারী সম্পাদক থাকাকালীন পরিষদের সাগ্রাহশালায় রক্ষিত বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য ভাস্কর্য, মুদ্রা, তাম্রশাসন, প্রস্তর ও ব্রোঞ্জের মূর্তি, কাগজের পুঁথি প্রভৃতির বর্ণনা সহ একটি তালিকা নিয়ে Descriptive List of Sculpture and Coins in the Musium of the Bangiya Sahitya Parishad, বাংলা বর্ণমালার উৎপত্তি নিয়ে The Origin of the Bengali Script, ভারতের প্রাচীন , মধ্য ও আধুনিক যুগ নিয়ে লিখিত History of India, শক শাসনের বর্ণনা নিয়ে The Scythim Period of Indian History, পাল যুগের লেখমালার উপর ভিত্তি করে The Palas of Bengal 1915, গুপ্ত ইতিহাস সংক্রান্ত এক অসমাপ্ত লেখা The Age of the Imperial Guptas সহ আরো অনেক ইংরেজি লেখা ।এতো কিছু একসঙ্গে লিখতে গিয়ে তিনি বহু সময় লেখক নিয়োগ করতেন। তিনি বলে যেতেন তাঁরা লিখে যেতেন। আশ্চর্যের হলেও তিনি একই সঙ্গে দুটি ভাষায় ভিন্ন বিষয়ে বলে যেতে পারতেন।
এ হেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ছিল খুবই ছোটো। মাত্র ৪৫ বছরের। এখন থেকে একশত চল্লিশ বছর আগে ১৮৮৫ সালের ১২ এপ্রিল অধুনা মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে তাঁর জন্ম হয়। যদিও কোথাও কোথাও তাঁর জন্ম তারিখ ১৩ এপ্রিল বলে প্রচারিত। তার চাকরির নথিতে লেখা রয়েছে ১৮৮৫ সালের এপ্রিল মাস। তবে তাঁর প্রয়াত পুত্র বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও পুরাতত্ত্ববিদ অদ্রীশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১২ ই এপ্রিল বলেই লিখেছেন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্র দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানালেন তাঁরা ১২ এপ্রিল দিনটিকেই তাঁর ঠাকুরদার জন্মদিন হিসাবেই মানেন। বিশিষ্ট আইনজীবী মতিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা কালীমাতা দেবীর অষ্টম গর্ভের সন্তান ছিলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ডাক নাম ছিল ননী।তাঁদের আগের সন্তান সবাই মারা গিয়েছিল। কালীমাতা দেবী ছিলেন মতিলালের দ্বিতীয়া স্ত্রী এবং কুচবিহারের মহারাজার দেওয়ানের কন্যা। অন্যদিকে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পূর্ব পুরুষ ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁয়ের প্রশাসনিক দপ্তরের বেতনভুক্ত কর্মচারী। প্রচণ্ড বৈভবের মধ্যেই রাখলদাসের পড়াশোনা শুরু হয় বহরমপুরে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুল থেকে তিনি বৃত্তি সহ এট্রাস পাস করেন। আর ওই বছরই মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি উত্তরপাড়ার মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে কাঞ্চনবালা দেবীর( ১৮৯১- ১৯৩১) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই কাঞ্চনবালা দেবীও খুবই বিদূষী মহিলা ছিলেন। তিনিও বাংলা সাহিত্যে অনেক মৌলিক রচনা উপহার দিয়েছেন। তার মধ্যে গুচ্ছ, স্তবক,রশির ডায়েরি, শনির দশা উল্লেখযোগ্য। সেই ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে রাখালদাস পড়াশোনার জন্য কলকাতায় আসেন এবং এফ এ পাঠ্যক্রমে পড়বার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।
শৈশব, বাল্য ও কিশোর কালের কিছুটা বহরমপুরে নবাবী আমলের বহু পুরানো স্থাপত্যের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা রাখালদাসের মননে মিশে গিয়েছিল। এর সঙ্গে বাল্যবন্ধু বোধিসত্ত্ব সেনের পিতা স্বনামধন্য ইতিহাস গবেষক রামদাস সেনের( ১৮৪৫-১৮৮৭) এর বিশাল গ্রন্থাগার দেখা ও পাঠের সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের একজন অন্যতম পুরাবস্তু ও প্রাচীন শিল্প দ্রব্যের সংগ্রাহক পূরণ চাঁদ নাহারের কাছাকাছি থাকা তাঁকে আরো অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ এনে দেয়। উল্লেখ্য বাবা মতিলাল নিযুক্ত ছিলেন আজিমগঞ্জের প্রয়াত জমিদার রায় বাহাদুর সেতার চাঁদের নাবালক পুত্র পূরণ চাঁদ নাহারের এস্টেটের অভিভাবক। এসবই ইতিহাসের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।এর পরেই তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে এফ. এ.; ইতিহাস বিভাগে সাম্মানিক এবং এম. এ. পাঠ্যক্রম পর্যন্ত পড়াশোনা করার সময় পেয়ে যান অধ্যাপক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ,অধ্যাপক টমাস এইচ হল্যান্ড ও জাদুঘরের পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহের ভারপ্রাপ্ত অধীক্ষক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লিপিতাত্ত্বিক ও ক্ষেত্ৰীয় গবেষক ডঃ থিওডর ব্লখ সহ বহু গুণী মানুষের সান্নিধ্য। তিনি যাতায়াত শুরু করেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, এশিয়াটিক সোসাইটি ও ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে।যা তাঁকে স্থাপত্যকলা, মুদ্রাতত্ত্ব, মুর্তিতত্ত্ব, লেখতত্ত্ব, জীবাশ্মবিদ্যা ইতিহাসের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলে। ১৯০৩ সালে রাখালদাসের পিতা মাতার মৃত্যু , পারিবারিক বিষয়ে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়েও পড়েন। তবু এরই মধ্যে তিনি গভীর ভাবে পড়াশোনার চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বহু ইতিহাস বিষয়ক লেখাও লিখতে থাকেন। আবার এই পড়াশোনা কিছুটা স্থগিত রেখে ১৯০৮সালে লক্ষ্ণৌ মিউজিয়ামে পুরাতাত্ত্বিক দ্রব্যাদির তালিকা প্রস্তুত করার আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে কিছুদিন কাজও করেন। পাশাপাশি তিনি ডঃ ব্লখের আমন্ত্রণে পড়াশোনা করা অবস্থাতেই ইন্ডিয়ান মিউজিউয়ামের একজন সাম্মানিক কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। যার সূত্র ধরে ১৯১০ সালে প্রেসিডেন্সি থেকে এম এ পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই রাখালদাস স্থায়ীভাবে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের স্থায়ী উৎখনন সহকারী হিসাবে দুই শত টাকা মাস মাহিনাতে যোগ দেন। শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন।
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র স্বনামধন্য ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ববিদ অদ্রীশচন্দ্র লিখেছেন “অতি অল্প সময়ে তাঁর কাজের পরিধি, দক্ষতা এবং প্রচুর জ্ঞানের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট হয়ে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের তৎকালীন সর্বাধ্যক্ষ স্যার জন মার্শালের ইচ্ছায় ১৯১১ সালে একটি নতুন পদ সৃষ্টি করে তাঁকে সহকারী অধীক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হয়। এবং ওই বছরই তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে মুদ্রাকক্ষের ভার অর্পণ করা হয়।”। এই পদে ছয় বৎসর কাজ করার সময় তিনি তাঁর দপ্তরে বহু গুরুত্বপুর্ন কাজ যেমন করেছিলেন তেমনি এই সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর অফিসের কাজের বাহিরেও বহু গবেষণা ধর্মী লেখা লিখেছিলেন। এর মধ্যে দি অরিজিন অফ বেঙ্গলি স্ক্রীপ্ট শীর্ষক গবেষণাপত্র দাখিল করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুবিলি রিসার্চ পুরস্কার লাভ করেন। পাশাপাশি খুবই উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো দুই খন্ডে বাংলার ইতিহাস প্রকাশ। তাঁর লেখালিখি সম্পর্কে বিশিষ্ট অধ্যাপক ও প্রয়াত প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র লিখেছেন” রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় একাধারে প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক উপন্যাস রচয়িতা ছিলেন। সাহিত্যজগতে এই ধরনের মণিকাঞ্চন সংযোগ বিরল। যিনি নিরন্তর গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ ও গ্রন্থ লিখেছেন সেই রাখলদাস কি না লিখে ফেললেন আট আটটি ঐতিহাসিক আখ্যায়িকা বা উপন্যাস – পাষাণের কথা, ধ্রুবা, করুণা, শশাঙ্ক, ধর্মপাল, ময়ূখ, অসীম, ও লুৎফ – উল্লা। একি কম কথা।”
যদিও তাঁর কাজের ধারা, প্রমাণ সাপেক্ষ ইতিহাসের প্রতি তাঁর একাগ্রতা, তাঁর চরিত্রের ঋজুতা তাঁর নিজের অফিসেই বহু শত্রুর জন্ম দেয়। যার ফলে তিনি বেশ কিছু সম্মানপ্রপ্তি থেকে বঞ্চিতও হন। এ প্রসঙ্গে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্র ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন বোর্ড সদস্য দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন তিনি তাঁর বাবার মুখে শুনেছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জামানায় রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কারমাইকেল’ অধ্যাপকের পদ না পাওয়াটা একটা বড় দুঃখ ছিল। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন তাঁর বাবা অদ্রীশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ মতো তাঁকেও বিজ্ঞান ছেড়ে ইতিহাস নিয়েই পড়াশোনা করতে হয়েছিল।
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ধনী বাবার সন্তান। বাল্যকাল থেকেই তিনি বিলাসিতার মধ্যে মানুষ হলেও তিনি ছিলেন আড্ডাবাজ ও বন্ধু বৎসল। তাঁর বাড়িতে প্রায়শই আড্ডা দিতে আসা বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও বন্ধু ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন,” রাখালবাবু ছিলেন খুব আয়াসী লোক। নিজের হাতে প্রায় কিছুই করতেন না। চাকরে জামাকাপড় পরাইয়া দিত, জুতোর ফিতা বাঁধিয়া দিত। খাওয়ার পরে আর একজন হাতে জল ঢালিয়া না দিলে মুখ ধুইতে পারিতেন না।লেখার বেলায়ও তাই। অফিস হইতে ফিরিবার সময় তাঁহার টাইপিস্ট ভুদেববাবুকে সঙ্গে লইয়া বাড়ি ফিরিতেন।
জলযোগান্তে এক আরাম কেদারায় শুইয়া তিনি গড়গড়ায় তামাক টানিতেন। সঙ্গে সঙ্গে মুখে বলিয়া যাইতেন আর ভুদেববাবু লিখিয়া যাইতেন।” তাঁর আড্ডাবাজ ও বন্ধু বৎসলের উল্লেখ করিয়া তিনি যোগ করিয়াছেন,” সিমলা স্ট্রিটে রাখালবাবুর বাড়িতে বহু সন্ধ্যায় আমরা মিলিত হয়েছি। মিষ্টান্নের ব্যবস্থা যে প্রচুর পরিমাণে হইত তাহা বলাই বাহুল্য। রাজসিক জলযোগ ছাড়াও মাঝে মাঝে রীতিমতো
নৈশভোজের ব্যবস্থা থাকিত।কথা সাহিত্যে সুপ্রসিদ্ধ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে আমি প্রথমে রাখলবাবুর বাড়িতেই দেখি।”
এ হেন রাখালদাসকে মহেন – জো – দারোর প্রাচীনত্ব আবিষ্কারের কৃতিত্বকে থেকে দূরে সরিয়ে দিতে তাঁকে কিছুটা চক্রান্ত করেই ওই সময়ই পূর্ব চক্রের অধীক্ষক হিসাবে বদলি করে দেওয়া হয়। ১৯২৪ সালের ৬ জুন তিনি কলকাতার অফিসে কাজে যোগ দেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তাঁকে আরো শাস্তি দিতে ১৯২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে চৌষট্টি যোগিনীর মন্দির থেকে তারা – মূর্তি চুরির অভিযোগে একটি কেস রুজু হয়। তদন্ত করে অথচ সেই মূর্তি মেলে উত্তর কলকাতার বাসুদেব পান্ডার কাছ থেকে। তবু তদন্তে রাখলদাসকে ১৯২৬ সালের ১৬ আগস্ট সাসপেন্ড করা হয়। পরে বিভাগীয় তদন্ত
কমিটির সিদ্ধান্তে ওই ১৬ আগস্ট দিনটিকেই অবসরের দিন হিসাবে ধরে নিয়ে তাঁকে চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়। এরপর অসুস্থ শরীর নিয়ে খুবই আর্থিক কষ্টের সঙ্গে তাঁর দিন কাটতে থাকে। এরই মধ্যে ময়ুরভঞ্জের মহারাজা স্যার পূর্ণচন্দ্র ভঞ্জদেবের আর্থিক সহায়তায় History of Orissa লেখেন। কখনও রাজা কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের পৌত্র রাজা প্রফুল্ল ঠাকুরের গৃহে শিক্ষকতাও করেন।অবশেষে পুরনো বন্ধু ব্যারিস্টার ও ঐতিহাসিক ডঃ কালীপ্রসাদ জয়সওয়ালের অনুরোধ ক্রমে কাশিমবাজারের মহারাজা দানবীর মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর আর্থিক সহায়তায় পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের আমন্ত্রণে বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান পদে যোগ দেন। কিন্তু ১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় ফিরে আসেন। আর ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনত্ব আবিষ্কারের একক কৃতিত্ব না পাওয়া এবং সেই সঙ্গে তাঁকে সম্পূর্ণ অকারণে চুরির অভিযোগে যুক্ত করে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া তিনি মেনে নিতে পারেন নি। এর ফলে ধীরে ধীরে মানসিক ও শারীরিক ভাবে খুবই ভেঙে পড়েছিলেন।
পাশাপাশি আজকের দিনে এটাও ঠিক যে স্বাধীনতাত্তোর কালে বিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাতায় সামান্য একটু অংশে হরপ্পা মহেন- জো – দারোর আবিষ্কার সম্পর্কে রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যুক্ত থাকলেও তাঁর এই বিশাল কর্মব্যপ্তি সম্পর্কে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের বইতে সেরকম আর কিছু দেখা যায় নি।যা জানা থাকলে বাংলার ছাত্র সমাজ আরেক জন আইকন সম্পর্কে একটু বেশি করে জানতে পারতো। ১৯৩০ সালের ২৩ মে শুক্রবার রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় তাঁর কর্মজীবনের এই সব দুঃখ নিয়ে মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।