তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশু ডাক্তার

১৯৫৫ সালে আর জি কর থেকে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে ডাক্তারী পাস। তারপর বছর দুয়েক সরকারি বেসরকারি বেশ কয়েকটি জায়গায় চাকরি। তবে কোথাও এক মাস কোথাও বা মাস দুয়েকের মতো। ঠিক ঠাক পোষাচ্ছিলো না।  ১৯৫৭ সালে রেলের একটি চাকরি পেয়ে ওড়িশার গোপালপুরে যাওয়া মনস্থির করলেন ডাক্তারবাবু। বাক্স প্যাটরা গুছিয়ে  প্রণাম করতে গেলেন কলকাতায় বসবাস করা গ্রামের এক কাকুর বাড়িতে।
যিনি তাকে অপত্য স্নেহে  চিরদিনই ভালোবেসে এসেছেন। ওখানে পৌঁছাতে কাকু সব শুনে বললেন , “বিশু, বাহিরে গিয়ে কি করবি? বাড়ি ফিরে যা।  গ্রামের রোগী দেখ গে। তোরও ভালো হবে। গ্রামের ও ভালো হবে।”  কথাটা মনে ধরলো। গোছানো বাক্স প্যাটরা নিয়ে কলকাতা থেকে উল্টো দিকের পথ ধরলেন ডাক্তারবাবু। ফিরলেন তাঁর নিজের  জন্মভিটেতে। বীরভূমের লাভপুরে। শুরু করলেন প্র্যাক্টিস। ভালো বেশে ফেললেন নিজের চারপাশকে।  ২৮ বছর বয়সে  শুরু করে প্রায় ৬০ বছর ধরে একই রুটিন মেনপিপি চলেছেন তিনি। এই ৯১ বছর বয়সে  আজও সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যে আটটা পর্যন্ত খাওয়ার ও সামান্য বিশ্রামের সময়টুকু বাদ দিলে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে  রোগী দেখে যাচ্ছেন। ক্লান্তিহীন ভাবে। ২ টাকা ফি থেকে শুরু করে আজ ফি করেছেন ১১০ টাকা। তাও সবাইয়ের থেকে পান না।তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই এই ডাক্তারবাবুর। তবে প্রতিদিন দিনের প্রথম রোগী থেকে যে ফিজ টুকু পান তা তিনি আলাদা করে রেখে দেন।এর থেকে প্রতি মাসে যা জমে তা তিনি পরের মাসের প্রথম দিনেই তুলে দেন তাঁর সেই কাকুর স্মৃতিরক্ষা তহবিলে। আবার অন্যদিকে সেই কাকুর বেশ কয়েকটি গল্প উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র হয়ে থেকে গেছেন তিনি নিজে।   সেই কাকু হলেন বিশিষ্ট কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ডাক্তার বাবুর পোশাকি নাম হলো  ডঃ সুকুমার চন্দ।যদিও এলাকায় তিনি বিশু ডাক্তার নামেই পরিচিত। আর তারাশঙ্করের গল্প উপন্যাসের পাঠকও  বিশু ডাক্তার বা   আশু ডাক্তার নামের যে মানুষটিকে পড়ে এসেছেন তিনিই এই ডঃ সুকুমার চন্দ। আজ ৯১ বছর বয়সে রোগী দেখার পাশাপাশি এলাকার প্রায় সব সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।থাকেন অতি সাধারণের মতো। আড়ম্বরহীন ভাবে।

কথা বলছিলাম লাভপুরের ডাক্তারবাবু    চেম্বারে বসে।বললেন এই গ্রামের বহু মানুষ ই তারাশঙ্কর বাবুর গল্প উপন্যাসের চরিত্র। আমিও তেমনি হয়ে গেছি। জানালেন ” আমি তখন আর জি করের ছাত্র।কলেজের হোস্টেলের প্রাচীরের একটি ফুটো দিয়ে কলেজে চত্ত্বর থেকে বেরিয়ে কাকুর বাড়িতে প্রায়ই যেতাম। তিনি তখন ‘আরোগ্য নিকেতন ‘ লিখছেন। সেই সময় তিনি আমার ও তাঁর ছোট জামাই বিশ্বনাথ রায়ের কাছ থেকে উপন্যাসের প্রয়োজনে বিভিন্ন ডাক্তারি পরিভাষা বুঝে নিতেন।  তারপর আমিই তাঁর গল্প উপন্যাসে চলে গেছি। শুক সারি গল্পে আমার ছবিও ছিল। আমার এই চেম্বারের সামনের রাস্তার বর্ণনা রয়েছে। রয়েছে এই রাস্তায় গ্রাম্য বিবাদের মারামারির চিত্রও। আসলে তিনি তাঁর আশেপাশের প্রায় সবাইকে কোন না কোনো চরিত্র হিসাবে ছাপার অক্ষরে চিত্রায়িত করেছেন।তবে এতজনকে চরিত্র বানাতে গিয়ে তিনি বাড়ি এসে ‘বিপদেও’ পড়তেন।কলকাতা থেকে  আসতেন পূর্ণ হয়ে । ফিরতেন  নিঃস্ব হয়ে।তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা থেকে লাভপুরে এলেই  গ্রামীন ভাষায়   নিচুজাতের মানুষরা যারা তার গল্প উপন্যাসের চরিত্র তাঁকে ঘিরে ধরতো। তিনি যে কয়দিন এখানে থাকতেন সে কয়দিন এদের ভিড় লেগেই থাকতো।পরের দিকে শুধু এরা নয় তাদের চরিত্রের উত্তরসূরিরাও ভিড় বাড়াতেন। তারা তাঁকে বলতে এবং বোঝাতে চাইতেন যে, বাপু তুমি আমাদের চিত্রায়িত করে বিখ্যাত হয়েছ। তাই তার দক্ষিণা তো আমাদেরই প্রাপ্য। এতে তারাশঙ্কর বাবু বিন্দুমাত্র ক্ষুব্ধ হতেন না। বরং এতে তাঁর প্রশ্রয় ছিল। তাই কলকাতা থেকে যা কিছু নিয়ে আসতেন তাদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন অকাতরে।বহুবার তিনি কলকাতা ফেরার দিন আমার  চেম্বারের সামনে এসে চিৎকার করে বলতেন, ওরে বিশু, পঞ্চাশ, একশো টাকা দে। কলকাতা ফেরার টাকা নেই। রাস্তার লোকেরা কেউ শুনলো কি শুনলো না তা তিনি ভ্রুক্ষেপ করতেন না। এসব ঘটনা তিনি তার খ্যাতির মধ্য গগনেও করে গেছেন। 

‘আর এসব ঘটনা শুরু হতো নাকি তিনি কলকাতা থেকে আসার সময় লাভপুর স্টেশনে নামার সঙ্গে সঙ্গেই।’  বললেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো, বিশিষ্ট চলচিত্র পরিচালক পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বললেন  একটা দুটো বাক্স বয়ে আনতে হাজির হতো তিন চার যান কুলি। হয়তো যেখানে এই কাজের জন্য  দরকার থাকতো এক জনের সেখানে তিন জন মিলে এই কাজ করতো। একবার তিনি জেঠুকে বলেছিলেন ” দেখো তোমাকে ঠকিয়ে এরা বেশি টাকা নিয়ে যায়।” কথাটা শুনে জেঠু মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ” বরং উল্টোটাই ঠিক।  কারণ এদের বেচেই তো আমি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ” তারপর থেকে এ বিষয়ে কেউ কোনোদিন কথা বাড়ায় নি।

ডাক্তারবাবুর চেম্বারে কথা বলার  মাঝেই ডাক্তারের বাবুর সহকারী দরজায় উঁকি দিয়ে বললেন দূর থেকে রোগী এসেছেন। ডাক্তারবাবু ইশারায় বললেন একটু বসতে বলুন। বললেন, সকাল আটটা থেকে শুরু হয়। ছেদ পড়ে সেই রাত আটটার পরে।’ কোথাকার রোগী মানে কত দূরের রোগী খবর নিয়ে বললেন,এখানে আমার পসার বেশ ভালোই।ভীড় সারাক্ষণ লেগে থাকে। সেই সকাল থেকে টানা রোগী দেখছি। এখন বেলা সাড়ে তিনটা। সকালবেলাতে দূর থেকে আসা রোগীদের দেখি।বিকালে স্থানীয়দের ।সেই বোলপুর, রামপুরহাট, কাটোয়া, কান্দি, সালার সহ বহু দূর থেকে রোগীরা আসেন।’ তারপরেই বললেন ‘আসবে নাই বা কেন! এক একজন রোগীকে  দশ বারো মিনিট ধরে কোন ডাক্তার দেখবে? আর আমিতো  এক্সট্রা অর্ডিনারী মেরিটের ডাক্তার নই যে দু মিনিটে রোগী দেখে দেব। যদিও আমি আজও বিশ্বাস করি  দু মিনিটে একটি রোগীকে দেখে দেওয়া সম্ভব নয়।রোগীর প্রেসার নিজের হাতে না মাপলে নিজেরই তৃপ্তি হয় না। আবার যে রোগী দেখে মনে হয় এর রোগ সারানো আমার কম্ম নয়, সেই রোগীকে আমি বিন্দুমাত্র ধরে রাখার চেষ্টা করি না। বললেন রোগী দেখা শুরু করেছিলাম দুই টাকা ভিজিট নিয়ে।আর আজ তা বাড়িয়ে করেছি এক শত দশ টাকা। 

সারাদিন এতো রোগী দেখে মাসে কত রোজগার হয় এখন? বেমক্কা এই প্রশ্নটা শুনে কিছুটা থমকে গেলেন। বললেন ‘একটা কথা বিশ্বাস করতে পারেন আমি যদি চার পাঁচ দিন চেম্বার করতে না পারি তবে আমি খেতে পাবো না। আমি হাঁ হয়ে গিয়েছি দেখে বললেন। অনেক কষ্টে একটি গাড়ি করেছি। কারণ আমার অসুখ। আমাকে হটাৎ হটাৎ কলকাতা ছুটতে হয় নিজের চিকিৎসার জন্য। তাই এই ব্যবস্থা। আর ফিজ বেশির ভাগ মানুষ দিতে পারলেও   অনেকেরই সামর্থ্য কুলায় না। তাদের ঔষধ কেনার সামর্থও থাকে না। তখন স্যাম্পেল ঔষধ তাদের দিয়ে দিতে হয়। আর তাছাড়া স্যাম্পেল ঔষধ গুলি ভারত সেবাশ্রম ও দু একটা আশ্রমে পাঠিয়েও দেই। এছাড়া প্রতিদিনের প্রথম রোগীর ফিজ যেমন তারাশঙ্করের ধাত্রী দেবতার ফান্ডে দিয়ে আসি, তেমনি কিছু ফিজ পাঠিয়ে দেই স্থানীয় সংস্কৃতি ভবনে। এছাড়া কিছু  পৌঁছে দেই স্থানীয় ফুল্লরা মন্দিরে। যেটি ৫১পিঠের একটি সতীপিঠ।এরপর যা থাকে তাতে চলে যায়।  যদিও সেই অর্থে আমরা বাড়িতে দুটি প্রাণী, কিন্তু পাত পড়ে সাত আট জনের। তাই কোনরকমে চলে যায়। এতেই আমি বেশ খুশি। ‘

কথা বলছিলাম স্থানীয় বাসিন্দা ,শিক্ষক, নাট্যকর্মী উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।  তিনি বললেন আমাদের ডাক্তারবাবু এক  ধন্বন্তরি। রোগী তাঁর কাছে দেবতা।  রোগী কোথা থেকে এসেছেন, কোন শ্রেণীর , তিনি ধনী না গরীব এ তাঁর কাছে বিচার্য নয়। তিনি জানালেন তাঁর এক বন্ধু যিনি সারা ভারত ঘুরে বেড়ান নাটক নিয়ে, তাঁর পেটের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা ডাক্তারবাবুকে  একটি বার দেখানোর পরে দিব্যি আছেন তিনি। অথচ ডাক্তারবাবু নিজে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ। আর স্থানীয় লোকেরা তো তাঁকে দেবতাই মানেন।  এ ব্যাপারে ডাক্তারবাবু জানালেন, ” সবাই দু বছরের ইন্টার্নশিপ করেন। আমার ক্ষেত্রে  সেটা তিন বছরের হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালের এমন কোনো বিভাগ ছিল না যেখানে আমি কাজ করিনি। সেটাই আমার সারা জীবনের সম্বল হয়ে রয়েছে। হয়তো আমি হয়ে উঠেছি Jack of all trades, master of none. বলেই চুপ করে গেলেন।

জিজ্ঞাসা করলাম  তারাশঙ্কর বাবুর চিকিৎসা কি আপনি করতেন? উত্তরে মুচকি হাসলেন ডাক্তারবাবু। বললেন “তিনি এখানে থাকলে প্রতিদিন নিয়ম করে, তাঁর বাড়ি সকাল বিকাল যেতে হতো। প্রেসার দেখে দিয়ে আসতে হতো। তাঁর স্বাস্থ্য সচেনতা ছিল। তাই প্রতিদিন এটা করতেই হতো। তবে এটার পাশাপাশি অনেক গল্প হতো। এলেই খবরা খবর নিতেন পাশাপাশি  লোকজনের। কে কেমন আছেন। এছাড়া তিনি আমাদের বাড়িতেও আসতেন।মায়ের সঙ্গে বসে অনেক গল্প করতেন।একগ আর প্রায় প্রতিদিন আমার কাছে আসতো ছোট ছোট চিরকুট। তাতে লেখা থাকতো ‘ বিশু, একে দেখে দিস, এর ইঞ্জেকসেনটা দিয়ে দিস। আমি পরে তোকে তোর আর তোর কম্পাউন্ডারের ফিজ দিয়ে দেব’। তবে আমি সে সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম । 

তবে বিল আর কোনদিন পাঠানো হতো না। তবে এ আমার কাছে অনেক অনেক পাওনা। সেদিন বুঝিনি এই চিরকুটগুলির কি মূল্য। তাই সেগুলি  সব আর আমার কাছে নেই।।  এ আমার চির দুঃখের কথা।

তবে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়  বিশু ডাক্তারকে  কতটা ভালোবাসতেন এবং কতটা নির্ভর করতেন তা একটি চিঠি পড়লেই বোঝা যায়।  সেটা                ১৯৬৯সাল। তারাশঙ্কর বাবুর মা তার আগে থেকেই বহুদিন শয্যাশায়ী। একবার কলকাতা ফিরে যাওয়ার সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে একটি চিঠি লিখে দিয়ে যান তাঁর আদরের  বিশুকে। 

‘প্রিয় বিশু,

কাল লোকজনের সামনে যা বলার ছিল তা বলতে পারি নি।যাওয়ার সময় স্টেশনে মনে হলো লিখে দিয়ে যাওয়াই ভালো। মার  হটাৎ কিছু ঘটলে ১০০/১৫০ যা লাগে তুমি দিয়ো।  বাবাকে উদ্ধারনপুর ঘাটে দাহ করা হয়েছিল। মার ইচ্ছে সেই চিতাতে দাহ হবার। আমি এসে তোমাকে দেব।

আর একটি কথা। চাষের সময় ৫ বিশ ধান প্রয়োজন হবে এখানে। তুমি যদি দাও তো ভালো হয়।পরে নেবে এ কথা বলাই বাহুল্য।

                                           শুভার্থী

                                   ইতি 

                  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

১৭।০৬।৬৯

চিঠিটা পড়লেই গায়ে কাঁটা দেয়। বোঝা যায় এঁদের সম্পর্ক কতটা গভীরে ছিল। এরকম বহু চিঠি আজ হারিয়ে গেলেও র দু একটি রয়ে গেছে ডাক্তারবাবুর কাছে। আর শ্মশানটি ছিল কাটোয়ায়। ভাগীরথীর ধারে। 

আবার একটি দুই লাইনের চিঠিতে এক রোগীর জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন,

বিশু,

তোমার কম্পউন্ডারের ফি আমি দেব।

এর স্বামীর Injection  দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে।

                          তারাশঙ্কর

                     ১৮।০৫।৬৩

    Sreeman bisu doctor

কথা প্রসঙ্গে  ডাক্তারবাবু জানালেন, তারাশঙ্করবাবু  একবার তার নাম  পাল্টে দিয়েছিলেন। বললেন, ” একবার পুজোর সময় তিনি এসেছেন। আমিও নিয়মমতো তাঁর বাড়ি গিয়েছি। কিন্তু আমাকে দেখে তিনি বললেন, ‘এসো আশু , এসো।’ দুঃখ হলো। কারণ এতদিনের নামটা তিনি ভুলে গেলেন ?আদরের বিশুকে ‘আশু’ বানিয়ে দিলেন! অভিমান হলেও  মুখে কিছু বলতে পারলাম না। তিনি ও কিছু বললেন না। তবে চমক তখনও বাকি ছিল। তারাশঙ্কর বাবু ফিরে গেলেন কলকাতায়। তারপরেই আমার হাতে এলো তাঁর লেখা  ‘সুখসারি কথা’। আর আশ্চর্যের কথা এই যে, সেটা পড়েই বুঝলাম সেখানের আশু ডাক্তারের চরিত্রই যে আমি! আর তখন খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। এমনই বুঁদ হয়ে থাকতেন তারাশঙ্করবাবু তাঁর গল্পের চরিত্রের মধ্যে।”

তারাশঙ্কর বাবুর সঙ্গে আপনার স্বম্পর্ক কি রকম ছিল?  বললেন , ‘ তারাশঙ্কর বাবু আর আমার বাবা শরত চন্দ সেই ন্যাংটো বেলার বন্ধু। উনি আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন। কলকাতা চলে গেলেও সেই স্বম্পর্ক ছিন্ন হয় নি। তাঁর আরোগ্য নিকেতন উপন্যাসের মূল  কাহিনী তিনি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। সেটা আবার তিনি বাবাকে  চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন। আবার সেই চিঠিতে তিনি তাঁর নতুন উপন্যাস লেখা শুরুর কথা বাবাকে জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় বলেছিলেন    লাভপুর  স্কুলের পটভূমি নিয়ে একটি নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন। সেখানে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক  শশীবাবুর  ছায়া নিয়ে চন্দ্রভূষণ তার উপন্যাসের নায়ক। তাই  বাবার স্কুল জীবনের অভিজ্ঞতা, স্কুলের খাতায় কি ধরনের রেজলিউসেন  নেওয়া হতো তা সত্তর লিখে পাঠানোর কথা বলেছিলেন। আসলে লাভপুরের বহু মানুষকে তিনি নামে বেনামে তার গল্প উপন্যাসের চরিত্র করে গেছেন। আর এগুলি মাটির কাছাকাছি ছিল বলেই এতো জনপ্রিয় হয়েছে। আবার আমি যখন ডাক্তারি পড়ি তখন আমার বাবা দুরারোগ্য কর্কট রোগে আক্রান্ত হন। কলকাতায় চিকিৎসা চলার সময় তারাশঙ্কর বাবু সপ্তাহে তিন চার দিন বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। এমনি ছিল বন্ধুত্ব। আমার বাবার মৃত্যুর পর তিনি প্রথা মেনে আমাকে কোনো চিঠি না লিখে আমার দাদা দেবুকে চিঠি লিখে তিনি তাঁর দুঃখের কথা জানিয়েছিলেন। শরীর অসুস্থ থাকায়  আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছিলেন।

 জিজ্ঞাসা করলাম  আজকের দিনে  আপনি প্রায় সব রকমের  রোগের চিকিৎসা করছেন। এখানকার লোকজনের  কি সত্যি বেশি ফিজ দেওয়ার  সামর্থ নেই। অন্তত পক্ষে যখন আপনার কাছে রোগী আসার শেষ নেই। সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত? কিছুক্ষন চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘ না মানুষ বেশি ফিজ দিতে চায়।ফিজ বাড়ালে  তারা অখুশি হন না। কিন্তু ফিজ  বাড়ানোর আগে অনেক দিন ধরে আমাকে ভাবতে হয়। বাড়াবো, নাকি বাড়াবো না। অনেক ভেবে ফিজ একটু বাড়িয়ে দেওয়ার পর তিন চার দিন রাতে আমার  ঘুম হয় না। ভাবি বাড়ানো উচিত হলো কিনা। আসলে আমার মা আমাকে একটা কথা বলতেন।’ বিশু ফিজ বেশি বাড়াবি না। ভগবান ঠিক চালিয়ে দেবে।’ তাই আজও  ফিজ বাড়ানোর সময় মাকে  মনে পড়ে যায়।ভাবি মা রাগ করবেন কিনা।

জিজ্ঞাসা করলাম এতো বছর ধরে মানুষ  দেখে আসছেন । কোনো পরিবর্তন দেখতে পান? বললেন, ‘অবশ্যই পাই।’ তারপর ছোট্ট কথায় বললেন ,” আগে মানুষের মন কম্পাউন্ড ছিল। এখন কমপ্লেক্স হয়ে গেছে। তবে আমার কোন শত্রু নেই। আসলে যদি কেউ শত্রুতা করবে বলে আসেও কিছুদিন পরে সে মিত্র হয়ে যায়। আর এক হাতে তো তালি বাজে না।’  কথাগুলো শুনলেই চুপ করে যেতে হয়। 

তবু চুপ না থেকে বললাম,”

 প্রথম দিন থেকে এখানেই আপনার চেম্বার ছিল?” এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন ,’ তা ছিল। একদম শুরুতে কিছুটা দূরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে রোগী দেখা শুরু করি। কিছুদিন পরে এখানে উঠে আসি। কিন্তু আমি বেশিটাই রোগী দেখেছি সাইকেল করে। এই ব্লকের এমন কোনো গ্রাম নেই, এমন কোনো পাড়া নেই যে আমার সাইকেলের চাকার ছাপ পড়ে নি। ব্লকের বাহিরেও বহু দূরে চলে গেছি সাইকেল করে রোগী দেখতে। তখন তো যানবাহনের অবস্থা ভালো ছিল না। আর ওই অবস্থায় রোগীকে তার বাড়ির লোকেরা আনবেই বা কিভাবে? তাই খবর পেলে আমাকে সাইকেলে যেতেই হতো। অন্য কোনো উপায় ছিল না যে।”

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *